সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি, দীর্ঘ হচ্ছে দুর্ভোগ

সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক:: যত সময় যাচ্ছে ততই সিলেটের বন্যাকবলিত মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। সিলেটের বন্যা পরিস্থিতি ক্রমশ অবনতির দিকে। বন্যায় সিলেটের বিভিন্ন সড়ক ডুবে গিয়ে উপজেলা ও জেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার এমনকি সরকারি দফতরগুলোতে উঠেছে পানি। বন্যাকবলিত হয়ে পড়া সিলেট নগরের আরও নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।

সুরমার তীরঘেঁষা শাহজালাল উপশহর, সোবহানীঘাট, ছড়ারপাড়, কালিঘাট, তালতলা, কাজিরবাজার, শেখঘাট, ঘাসিটুলা, লালাদিঘির পাড় এলাকাসহ মহানগরের অন্তত ২০টি ওয়ার্ডে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। বন্যার পানিতে শত শত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাসা-বাড়ির জিনিসপত্র ভিজে নষ্ট হয়েছে। জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে সবখানে।

বুধবার (১৮ মে) নগরের বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, বন্যা কবলিত এলাকার মানুষের জন্য নগরে ১৬টিসহ ২৭৪টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন লোকজন। তাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সর্বশেষ ২০০৪ সালের বন্যায় নগরে অনেক এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। এরপর প্রতি বর্ষায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলেও এবারের মতো বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি।

ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেটের সীমান্তবর্তী কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, জৈন্তাপুর, জকিগঞ্জ, দক্ষিণ সুরমা ও সিলেট সদরসহ বিভিন্ন উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। জেলার বাকি উপজেলাগুলোরও নিম্নাঞ্চলে বন্যা দেখা দিয়েছে।

উপশহরের বাসিন্দা মারুফ আহমদ বলেন, পরিবার নিয়ে নিজের বাসায় আছি। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বাসার পাশের রাস্তায় ও পার্কিংয়ে হাঁটু পানি হয়ে গেছে। বন্যা পরিস্থিতিতে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।

ছড়ারপাড় এলাকার বাসিন্দা লাকি মিয়া বলেন, সোমবার রাত থেকেই পানিবন্দী ছিলাম। মঙ্গলবার রাতে পানি আরও বেড়ে যাওয়ার আতঙ্কে বাসা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন।

এদিকে, নগরের কালিঘাটে অনেক দোকানের চালসহ বিভিন্ন মালামাল ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। অনেকে ট্রাক দিয়ে মালামাল সরিয়ে নিতে দেখা গেছে।

সিলেট সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী আলী আকবর বলেন, নগরে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। নগরের ২৭টি ওয়ার্ডের অর্ধেকের বেশি এলাকায় পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। রাস্তাঘাত ডুবে গিয়ে যান চলাচলও বন্ধ রয়েছে। মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান নিচ্ছেন।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বুধবার রাত ১০ থেকে ১টা পর্যন্ত সিলেট বিভাগের উপর দিয়ে তাণ্ডব চালাতে পারে কালবৈশাখী। এছাড়াও ভারতের মেঘালয় রাজ্য ভারি বৃষ্টি হবে। বিশেষ করে শিলং ও ডাউকিতে। ফলে সিলেটের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির প্রবল আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এবারের বন্যা দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

গত এক সপ্তাহের অব্যাহত বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা ঢলে বন্যা দেখা দিয়েছে সিলেটের বেশিরভাগ উপজেলায়। সিলেট সদর, জকিগঞ্জ, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলায় লাখো মানুষ এখন পানিবন্দী। চরম দুর্ভোগের মধ্যে এখন দিন পার করছেন এসব মানুষ। বন্যা কবলিত এসব এলাকার প্রধান প্রধান সড়ক ডুবে যাওয়ায় সিলেট শহরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে আড়াই শতাধিক আশ্রয়কেন্দ্র।

সিলেটে অকাল বন্যায় দুর্ভোগে পড়া মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সিলেট-১ আসনের এমপি ড. এ কে আব্দুল মোমেন, সিলেট-১ আসনের এমপি হাফিজ মজুমদার, সিলেট-৩ আসনের এমপি হাবিবুর রহমান হাবিব প্রমুখ। তাঁরা বন্যা দুর্গত এলাকাগুলো পরিদর্শন শেষে ত্রাণ বিতরণ করে যাচ্ছেন।

সিলেট জেলা ত্রাণ কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম বলেন, জেলায় ২৭৪টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এরমধ্যে ৭৮টিতে মানুষ অবস্থান করছেন। এছাড়া বন্যার্তদের জন্য এ যাবত ১৪৯ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এরসঙ্গে ১ হাজার বস্তা শুকনো খাবারও বরাদ্দ করা হয়েছে।

আর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এনামুল হক জানান, সিলেটে বন্যাদুর্গত এলাকায় ২৫ লক্ষ টাকা ও ২০০ মেট্রিকটন চাল বরাদ্দ দেওয়া। প্রয়োজনে আরও বরাদ্দ দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকার প্রস্তুত আছে। আমরা সিলেটের দুর্গত এলাকা ঘুরে ঘুরে দেখবো এবং খোঁজখবর নেব। পাশাপাশি প্রশাসনের কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করবো। সবার সাথে আলাপ করে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে জানবো। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন