সিলেটে পুলিশি নির্যাতনে রায়হান হত্যা : সাক্ষ্য দিলেন মামলার বাদি

সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক:: সিলেট মহানগর পুলিশের বন্দরবাজার ফাঁড়িতে পুলিশি হেফাজতে নিহত হওয়ায় রায়হান আহমদ হত্যা মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বুধবার (১১ মে) মহানগর দায়রা জজ আদালতে মামলার বাদি ও রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নী সাক্ষ্য প্রদান করেন। বৃহস্পতিবার নিহত রায়হানের মা ও চাচার সাক্ষ্যগ্রহণের কথা রয়েছে।

সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) নওশাদ আহমেদ চৌধুরী জানান, বাদীর সাক্ষ্য গ্রহণ নেয়া হয়েছে। পরে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা নিজেদের প্রস্তুতি নেই বলে সময় চান। আদালত তাদেরকে একদিন সময়ে দিয়েছেন। আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) তারা বাদিকে জেরা করবেন। জেরা শেষ হওয়ার পর আরও দুজন সাক্ষী স্ট্যান্ডবাই আছেন, তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে।

আগামীকাল বৃহস্পতিবার রায়হানের মা সালমা বেগম ও চাচা আদালতে সাক্ষ্য দিতে পারেন বলে তিনি জানান।

এদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা রায়হান হত্যা মামলায় অভিযোগ গঠনের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে পিটিশন দিয়েছেন। তারা মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম স্থগিত রাখতে আদালতে আবেদন জানান।

এ প্রসঙ্গে পিপি নওশাদ চৌধুরী বলেন, ‘আসামিপক্ষ যে মহামান্য হাইকোর্টে গিয়েছেন, সেটার ওপর দীর্ঘ শুনানি হয়েছে। আমি বলেছি, এই মুহূর্তে এটা স্থগিত রাখার কোনো আইন নাই। এই কারণে আইন নাই, মহামান্য হাইকোর্ট থেকে তারা যদি স্টে অর্ডার আনতেন, তাহলে আমরা সবাই মানতে বাধ্য। যেহেতু কোনো স্টে অর্ডার নাই, উনারা একটা নাম্বার দিয়ে ফাইল করেছেন, হাইকোর্টের কোন বেঞ্চে আছে, কবে নাগাদ হবে, এগুলোর কোনো দিকনির্দেশনা নাই। একটা চলমান মামলা, সব মামলাই সেনসেশনাল, এই মামলা আরও বেশি সেনসেশনাল, এটাতে তো আমরা অহেতুল বিলম্ব করতে পারি না। যদি হাইকোর্ট কোনো আদেশ দেন, উনারা (আসামিপক্ষ) কিছু যদি নিয়ে আসেন, তাহলে সাক্ষ্যগ্রহণ বন্ধ রাখা হবে। মূলত এরপর বুধবার আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।’

তিনি জানান, এই মামলায় ৬৯ জন সাক্ষী রয়েছেন।

এদিকে, রায়হান হত্যা মামলার পলাতক আসামি আব্দুল্লাহ আল নোমানের বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে ‘স্টেট ডিফেন্স’ করবে বলে জানিয়েছেন পিপি নওশাদ।

রায়হান হত্যা মামলায় গত বুধবার (১০ মে) সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ ধার্য ছিল। তবে একজন আইনজীবীর মৃত্যুতে কোর্ট রেফারেন্স থাকায় এবং আসামিপক্ষ হাইকোর্টে পিটিশনের কথা জানানোর প্রেক্ষিতে সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি।

রায়হান হত্যা মামলাটি হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইন তৎসহ ৩০২ দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারা ও ২০১ ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। কিন্তু আসামিপক্ষ শুধুমাত্র হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইনে মামলাটি চালাতে চান। এজন্য অভিযোগ গঠনের বিরুদ্ধে তারা হাইকোর্টে গেছেন।

সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য বুধবার দুপুরে রায়হান হত্যা মামলার আসামি বরখাস্তকৃত এসআই আকবর হোসেন ভুঁইয়াসহ অন্যান্যদের কারাগার থেকে আদালতে নিয়ে আসা হয়।

এর আগে গত ১৮ এপ্রিল সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আবদুর রহিমের আদালতে ৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে রায়হান হত্যা মামলার বিচার শুরু হয়। এরও আগে ১২ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের তারিখ থাকলেও সেটি পিছিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

২০২০ সালের ১১ অক্টোবর ভোরে সিলেট শহরের আখালিয়ার এলাকার বাসিন্দা রায়হান আহমদকে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। পরে তাকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে তিনি সেখানে মারা যান। পরদিন তার স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নী কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলাটির তদন্তে প্রথমে পুলিশ ছিল। পরে সে বছরের ১৩ অক্টোবর মামলাটি স্থানান্তর করা হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে। গত বছরের ৫ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক আওলাদ হোসেন আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। ১ হাজার ৯০০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।

যে ছয়জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়, তাদের পাঁচজনই পুলিশ সদস্য। তারা হলেন- বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভুঁইয়া, এসআই হাসান উদ্দিন, এএসআই আশেক এলাহী, কনস্টেবল টিটুচন্দ্র দাস ও হারুনুর রশিদ।

অভিযুক্ত অপরজন কথিত সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল নোমান, যার বাড়ি কোম্পানীগঞ্জে। তার বিরুদ্ধে ঘটনার পর ভিডিও ফুটেজ গায়েব করার অভিযোগ রয়েছে।

এই ছয়জনের বিরুদ্ধেই অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। অভিযুক্ত পাঁচ পুলিশ সদস্য কারাগারে থাকলেও নোমান এখনও পলাতক রয়েছেন।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর সিলেটের অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর আদালতের বিচারক আবুল মোমেন রায়হান হত্যা মামলার চার্জশিট গ্রহণ করেন। বাদীপক্ষ চার্জশিটের বিপক্ষে নারাজি দেয়নি। আদালত পলাতক নোমানের বিরুদ্ধে পরোয়ানাও জারি করেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন