জুনে শেষ সিলেট বিভাগের সর্ববৃহৎ রাণীগঞ্জ সেতুর কাজ, আগস্টে চলবে যানবাহন

সারাদেশ

মো. মুন্না মিয়া:: সুনামগঞ্জ জেলাবাসীর স্বপ্নের রাণীগঞ্জ সেতুর কাজ ইতিমধ্যে প্রায় ৯৬ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আড়াই কিলোমিটারের এ  সেতুর নির্মাণ ব্যয় ১৫৫ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। নির্মিতব্য এ সেতুর কাজ আগামী জুন মাসে সম্পন্ন হলেও আগস্টে চলাচলের জন্য ছেড়ে দেয়া হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। সিলেট বিভাগের সর্ববৃহৎ এ  সেতু দিয়ে যানচলাচল করলে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সুনামগঞ্জের দূরত্ব প্রায় ২ ঘণ্টা কমে আসবে বলে সংশ্লিষ্টের ধারণা। এতে দুর্ভোগ কমবে সুনামগঞ্জ জেলাবাসীর।

সেতুর কাজ প্রায় শেষ হওয়ায় প্রতিক্রিয়া জানতে গত সোমবার রাতে পরিকল্পনা মন্ত্রী এমএ মান্নান এমপির মুঠোফোনে কল দেয়া হয়। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সংশ্লিষ্টদের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “সুনামগঞ্জে জেলাবাসীর জন্য এটি ‘পদ্মা সেতু’। আমাদের পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হলে সমগ্র জেলাবাসীর অর্থ বাঁচবে, সময়, ও দুর্ভোগ কমবে। আমরা দ্রুত রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবো। যদিও করোনার কারণে সেতুটি কাজ অনেকেটাই পিছিয়ে ছিল। তবে জুনে সেতু কাজ শেষ হবে জেনে আমি আনন্দিত ও উৎপুল্ল। আশাকরি জেলাবাসী অনেকটাই উপকৃত হবেন। এজন্য আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ও সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। তাঁদের সর্বাত্মক সহযোগিতা না পেলে আমি এতোবড় একটি প্রকল্প কাজ সম্পন্ন হতো না।”

তিনি আরও বলেন, ‘ইতিমধ্যে সুনামগঞ্জের আরও বেশ কয়েকটি বড় বড় প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। যথাসময়ে এসব প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হবে। আমাদের দেশ আগের চেয়ে অনেক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধ। পৃথিবীর বুঁকে একটি উন্নতশীল রাষ্ট্রের পরিচয় পাচ্ছে। আমাদের উন্নয়নের মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার দ্বারা বাস্তবায়িত হচ্ছে। আমাদের দেশকে সামনের দিকে আরও এগিয়ে নিতে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব অপরিসীম ও অতুলনীয়। উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে উন্নয়নের পক্ষে কাজ করতে হবে এবং নৌকায় ভোট দিতে হবে।’

স্থানীয়রা জানান, বর্তমানে কুশিয়ারা নদী পারাপারের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে নৌযান। সুনামগঞ্জ জেলাবাসীর দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে ২০১৫ সালে রাণীগঞ্জে ফেরির কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বর্তমান পরিকল্পনা মন্ত্রী আলহাজ্ব এমএ মান্নান এমপি। বর্তমানে ফেরি ও খেয়া নৌকা দিয়ে পারাপার হচ্ছেন জেলার লক্ষাধিক জনগণ। এ দুই মাধ্যমে যানবাহন ও সাধারণ মানুষরা রাজধানী ঢাকার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন। এ সেতুটি চালু হলে দুই পাড়ের মানুষের ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসবে এবং ঢাকার সাথে সুনামগঞ্জ, জগন্নাথপুরের কয়েক লক্ষ মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও সহজ হবে। এতে বাঁচবে সময়ও। এজন্য স্থানীয় সাংসদ পরিকল্পনা মন্ত্রী আলহাজ্ব এমএ মান্নান এমপির প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান স্থানীয়রা।

জানা যায়, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়াত আবদুস সামাদ আজাদ ঢাকার সাথে সুনামগঞ্জের মানুষের যোগাযোগের সময় কমিয়ে আনার জন্য দক্ষিণ সুনামগঞ্জ বর্তমানে শান্তিগঞ্জ উপজেলার ডাবর পয়েন্ট হতে জগন্নাথপুর-রানীগঞ্জ-আউশকান্দি আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণ করেন। কিন্তু মহাসড়ক নির্মাণ করলেও ওই সময়ে কুশিয়ারা নদীর উপর রাণীগঞ্জ সেতু নির্মাণ ও ফেরি কার্যক্রম শুরু সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে ২০০১ সালে চার দলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় গেলে থমকে যায় এসব উন্নয়ন কাজ। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন ২০০৫ সালের ২৭ এপ্রিল আবদুস সামাদ আজাদের মৃত্যু হলে ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে সুনামগঞ্জ-৩ আসন থেকে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হয়ে বিপুল ভোটে সাংসদ নির্বাচিত হন সজ্জ্বন রাজনীতিবিদ বর্তমান পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান।

এম এ মান্নান সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার পর প্রয়াত জাতীয় নেতা আবদুস সামাদ আজাদের অসমাপ্ত কাজ দ্রুত বাস্তবায়নে এগিয়ে আসেন। জগন্নাথপুর-শান্তিগঞ্জ তথা সুনামগঞ্জের মানুষকে আশার আলো দেখাতে থাকেন। এই ধারাবাহিকতায় সজ্জন এ রাজনীতিবিদের প্রাণপন প্রচেষ্টায় ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে ১৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সুনামগঞ্জ জেলাবাসীর স্বপ্নের রাণীগঞ্জ সেতুর নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে নিয়ে। সেতুটির নির্মাণ কাজ পায় মেসার্স এমএম বিল্ডার্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড নামের এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

অ্যাপ্রোচ সড়কসহ সেতুটির দৈর্ঘ্য আড়াই কিলোমিটার হলেও মুল সেতুর দৈর্ঘ্য ৭০২.৩২ মিটার ও প্রস্ত ১০.২৫ মিটার। মুল সেতুর নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৯১ কোটি টাকা। বাকি ব্যয় ধরা হয়েছে অ্যাপ্রোচ সড়ক, টোলপ্লাজা, কালভার্ট ও স্থানীয় ইটাখলা নদীর উপর আরেকটি ছোট সেতু নির্মাণে। ইতিমধ্যে মুল সেতুর ৯৬ ভাগ কাজ শেষ হয়ে গেছে।

টেকসই উন্নতমানের সেতুর কাজ দ্রুত শেষ করতে কয়েক দফা সেতুটি পরিদর্শনসহ সব সময় খোঁজ খবর রাখছেন স্থানীয় সাংসদ পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। চলতি বছরের জুন নাগাদ সেতুটির কাজ শেষ হবে। ইতিমধ্যে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে জগন্নাথপুর তথা সুনামগঞ্জের দূরত্ব কমানোর লক্ষ্যে ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ডাবর-জগন্নাথপুর-আউশকান্দি আঞ্চলিক মহাসড়কের প্রশস্তকরণ ও  ড্রেনেজসহ ২২ কিলোমিটার সড়ক পুননির্মাণের কাজ শেষ হয় এবং ডাবর থেকে জগন্নাথপুর অংশে পুরাতন ৭টি  সেতু ভেঙে ১১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন ৭টি সেতু নির্মাণ করা হয়।

স্বপ্নের রাণীগঞ্জ সেতু নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর্যায়ে আসায় পরিকল্পনা মন্ত্রী আলহাজ্ব এমএ মান্নান এমপিকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও সাবেক জেলা পরিষদ সদস্য হাজী মাহতাব উল হাসান সমুজ। তিনি বলেন, ‘আমরা অনেক নেতাকে দেখেছি তারা স্বপ্ন দেখিয়ে চলে গেছেন। বাস্তবায়ন করতে পারেননি। কিন্তু বর্তমানে এমন এক নেতাকে পেয়েছি যিনি  আমরা যা স্বপ্নেও দেখি নাই এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন ; সত্যিই তা প্রশংসা করতে হয়। তিনি আমাদের জেলায় একাধিক বড় বড় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে আমাদের স্বপ্নের রাণীগঞ্জ সেতুর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। আগামী জুনে পুরো কাজ শেষ হবে। এতে হাওরবাসী খুশি ও আনন্দিত। এজন্য আমরা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ও আমাদের স্বপ্নের নায়ক হাওরবাসীর অহংকার আমাদের সাংসদ মাননীয় পরিকল্পনা মন্ত্রী আলহাজ্ব এমএ মান্নান এমপি মহোদয় সহ সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।’

সুনামগঞ্জের সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘সেতুটির ৯৬ ভাগ কাজ হয়ে গেছে। জুন মাসে সেতুটির শতভাগ কাজ সম্পন্ন হবে। তবে আনুষাঙ্গিক আরও কিছু কাজ থাকায় আগস্টে সেতুটি চালু করা হবে।’

সংবাদটি শেয়ার করুন