সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি মমতাজ, সম্পাদক দুলাল

জাতীয়

খবরটুডে ডেস্ক:: দেড় মাস আগে হওয়া সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করেছে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের গঠিত নতুন নির্বাচন উপ-কমিটি। হট্টগোল, ভাঙচুর-মারামারির পর ভোট গণনা করে বুধবার (২৭ এপ্রিল) রাত ১০টায় ফলাফল ঘোষণা করেন নির্বাচন উপ কমিটির আহ্বায়ক মো. অজি উল্লাহ।

পেশাজীবী সংগঠনের এই নির্বাচনে আওয়ামীপন্থীরা ‘সাদা প্যানেল’ এবং বিএনপিপন্থীরা ‘নীল প্যানেল’ হিসেবে পরিচিত। ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবীদের নেতৃত্বদানকারী সংগঠনটিতে এবার কোনো প্যানেলই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি।

সভাপতি ও সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ সমর্থিত সাদা প্যানেলের মো. মোমতাজ উদ্দিন ফকির মো. আব্দুন নূর দুলাল।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির গত নির্বাচনে ১৪টি পদের মধ্যে সভাপতিসহ আটটি পদে সরকার সমর্থকরা সাদা প্যানেল থেকে নির্বাচিত হন। আর সম্পাদকসহ ছয়টি পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপি সমর্থক নীল প্যানেলের আইনজীবীরা।

এবার সভাপতি, সহসভাপতি দুটি পদ, সম্পাদক ও তিনটি সদস্য পদসহ মোট সাতটি পদে জয় পেয়েছে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ সমর্থিত সাদা প্যানেল। অন্যদিকে কোষাধ্যক্ষ, সহসম্পাদকের দুটি পদ এবং সদস্যের চারটি পদসহ মোট সাতটি পদে জয় পেয়েছে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য প্যানেল সমর্থিত নীল প্যানেল।

সভাপতি-সম্পাদক পদ বাদে সাদা প্যানেল থেকে এবারের নির্বাচনে সহসভাপতি পদে মো. শহীদুল ইসলাম ও মোহাম্মদ হোসেন নির্বাচিত হয়েছেন। আর সদস্য পদে নির্বাচিত হয়েছেন ফাতেমা বেগম, শাহাদাত হোসাইন (রাজিব) ও সুব্রত কুমার কুণ্ডু। অন্যদিকে নীল প্যানেল থেকে কোষাধ্যক্ষ পদে মোহাম্মদ কামাল হোসেন ও দুটি সহ সম্পাদক পদে যথাক্রমে মাহফুজ বিন ইউসুফ ও মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান খান নির্বাচিত হয়েছেন। এ প্যানেল থেকে সদস্য পদে নির্বাচিতরা হলেন- কামরুল ইসলাম, মাহদীন চৌধুরী, মো. গোলাম আক্তার জাকির ও মো. মঞ্জুরুল আলম (সুজন)।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির মিলনায়তনে স্থাপন করা ৫১টি বুথে গত ১৫-১৬ মার্চ চলে ভোটগ্রহণ। সমিতির ১৪টি পদের বিপরীতে এবারের নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন ৩৩ জন। এর মধ্যে কার্যকরী কমিটির সাতটি সদস্য পদের ভোট ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয়।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ ওয়াই মশিউজ্জামানের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি উপ-কমিটি নির্বাচন পরিচালনায় দায়িত্ব পালন করলেও গত দেড়মাসে এ কমিটি ফলাফল ঘোষণা করেনি। এবারের নির্বাচনে মোট ৮ হাজার ৬২৩ জন ভোটারের মধ্যে ৫ হাজার ৯৮৩ জন ভোট দিয়েছেন।

গত ১৫-১৬ মার্চ ভোটের পর ১৭ মার্চ বিকেল সাড়ে চারটা থেকে ভোট গণনা শুরু হয়। তবে সম্পাদক পদে ভোট গণনায় ত্রুটির অভিযোগ আনেন আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা। পরে ওইদিন মাঝ রাতে সম্পাদক পদে পুনরায় ভোট গণনা চেয়ে নির্বাচন পরিচালনা সংক্রান্ত উপকমিটির আহ্বায়কের কাছে আবেদন করেন সাদা প্যানেলের সম্পাদক প্রর্থী মো. আবদুন নুর (দুলাল)। এক পর্যায়ে ফলাফল ঘোষণা না করেই স্থান ত্যাগ করেন নির্বাচন পরিচালনা উপ কমিটির সদস্যরা। এর একদিন পর জানা যায় এ ওয়াই মশিউজ্জামান নির্বাচন পরিচালনা উপ কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু নীল প্যানেলের সম্পাদক প্রার্থী দাবি করেন এ ওয়াই মশিউজ্জামানের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়নি।

পরবর্তীতে সমিতির সভাপতি-সম্পাদকদের নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা সমাধানের উদ্যোগ নেন বিগত কমিটির সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস কাজল। তারপরও সমাধান না আসায় গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সুপ্রিম কোর্টের সাংবাদিকদের সংগঠন ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের কার্যারলয়ে আকস্মিক এক সংবাদ সম্মেলনে এসে সামতির সাবেক নেতা অজি উল্লাহ ঘোষণা দেন যে, সাত সদস্যের নতুন নির্বাচন উপ-কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি বুধবার ভোট পুনর্গণনা করে ফলাফল ঘোষণা করবে। তবে এ উপ কমিটিকে অবৈধ অ্যাখ্যা দিয়ে বুধবার দুপুরে একই স্থানে সংবাদ সম্মেলন করেন নীল প্যানেলের সম্পাদক প্রার্থী রুহুল কুদ্দুস কাজলের নেতৃত্বে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা। এরপর বিকেলে মো. অজি উল্লাহ নেতৃত্বাধীন ‘নির্বাচন উপ-কমিট ‘ভোট পুনর্গণনার জন্য আইনজীবী সমিতি ভবনের তিন তলায় সম্মেলন কক্ষে ঢুকতে গেলে বাধা হয়ে দাঁড়ান বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা। এ কক্ষেই অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ব্যালটসহ অন্যান্য জিনিসপত্র রাখা আছে। এসময় দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে প্রথমে ধাক্কধাক্কি শুরু হয়।

এক পর্যায়ে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা তালা ভেঙে কক্ষে ঢুকে পড়েন। তখন কক্ষের বাইরে থাকা বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা কক্ষের কাচ ভাঙচুর করে কক্ষের বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেন। তখন কক্ষের ভেতরে-বাইরে থাকা আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা বিদ্যুৎ চালু করতে গেলে হাতাহাতি, কিলঘুষির ঘটনা ঘটে। দুই পক্ষকেই এসময় পাল্টাপাল্টি স্লোগানও দিতে দেখা যায়। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পরে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা সরে গেলে ভোট গণনা শুরু করেন অজি উল্লাহর নেতৃত্বাধীন নির্বাচন উপ কমিটি। ভোট গণনার সময় সাদা প্যানেল থেকে নির্বাচিত সম্পাদক আব্দুন নূর দুলাল ভেতরে ছিলেন। বাইরে ছিল আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের ভিড়। নীল প্যানেলের সম্পাদক প্রার্থী রুহুল কুদ্দুস কাজলকে এসময় বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের নিয়ে সমিতি ভবনের নিজের চেম্বারে বসে তাকতে দেখা গেছে। এরপর রাত ১০টায় ফল গোষণা করেন মো. অজি উল্লাহ।

ঘোষিত ফলাফলের বিষয়ে জানতে চাইলে রুহুল কুদ্দুন কাজল বলেন, ‘এ ফলাফল সম্পূর্ণ অবৈধ। আজকে সংবাদ সম্মেলন করে বলেছি যে, নতুন যে নির্বাচন উপ কমিটি গঠন করা হয়েছে তাদের এ কমিটি গঠন করার কোনো ক্ষমতা নাই। কারণ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির বিগত কার্যীকরী কমিটিতে ১৩ জন সদস্য। সাতজন মিলে সিদ্ধান্ত নিয়ে নির্বাচন উপ কমিটি গঠন করা যায় না। এ ওয়াই মশিউজ্জামানের নেতৃত্বাধীন উপ কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে গঠিত হয়েছিল। কিন্তু অবৈধভাবে উপ কমিটি করে তালা ভেঙে ব্যালট পেপার ছিনতাই করে এবং সম্পাদকের কক্ষ দখল করে আওয়ামী লীগের মনগড়া ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। এ ফলাফল আমি প্রত্যাখ্যান করছি। ’

ফলাফল ঘোষণার পর প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে বিজয়ী সম্পাদক মো. আব্দুন নূর দুলাল বলেন, ‘সত্যের জয় হয়েছে। এর বেশি আর কিছু বলব না, আলহামদুলিল্লাহ। অতি সাধারণ একটা কথা, আমি দলনিরপেক্ষভাবে সমিতি চালাবো ইনশাল্লাহ। ’

গত বছর এ নির্বাচনে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু। আর সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন রুহুল কুদ্দুস কাজল। নির্বাচনের পরপরই করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে মতিন খসরুর মৃত্যুতে সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ আওয়ামীপন্থী অংশ সভাপতি হিসেবে অ্যাটর্নি জেনারেল এ  এম আমিন উদ্দিনের নাম ঘোষণা করে। কিন্তু এতে আপত্তি তোলে বিএনপিপন্থীরা। এ নিয়ে বিশেষ সাধারণ সভায় হট্টগোলও হয়। পরে সভাপতি পদটি অমিমাংসিত রেখেই এক বছর চলে সমিতির কার্যক্রম।

সংবাদটি শেয়ার করুন