‘জমজমাট’ সিলেটের ঈদ বাজার

সারাদেশ

মো. মুন্না মিয়া:: আর মাত্র কয়েকদিন পর পবিত্র ঈদুল ফিতর। মুসলিম সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় এই উৎসবকে ঘিরে বর্ণিল সাজে সেজেছে পুরো সিলেট নগর। নগরের প্রতিটি মার্কেট আর শপিংমল আলোকসজ্জা করে বাহারি রংয়ে সাজিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে এমন সাজসজ্জা করেছেন বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ক্রেতা-বিক্রেতাদের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে বলে মহানগর পুলিশ জানিয়েছে। যানজট নিরসনে কাজ করছে ট্রাফিক পুলিশ ও মার্কেটের নিযুক্ত স্বেচ্ছাসেবীরা। ক্ষতি পুষিয়ে তোলার আশা করছেন ব্যবসায়ীরা। বেশি দামে পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে বলে ক্রেতারা অভিযোগ করেছেন।

  • রঙিন শপিংমল ও মার্কেট।
  • ক্রেতাদের অভিযোগ পণ্যের দাম বেশি।
  • করোনার ক্ষতি পোষানোর আশা ব্যবসায়ীদের।
  • ক্রেতা-বিক্রেতাদের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলাবাহিনী তৎপর।
  • যানজট নিরসনে ট্রাফিক পুলিশ ও মার্কেটের স্বেচ্ছাসেবীরা।

মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে গেল দু’বছর বিধিনিষেধের কারণে সাদামাটা ঈদ উদযাপন করা হয়েছে। করোনা ভাইরাসের দাফট কমে আসায় পুরোনো রূপে ঈদ উদযাপনে মেতে উঠেছেন সিলেটের জনসাধারণ। সিলেটবাসী সবসময়ই নতুনত্বে বিশ্বাসী। তাই ক্রেতাদের চাহিদার কথা ভেবে সিলেটের বিভিন্ন শপিংমল ও মার্কেটের ব্যবসায়ীরা নতুন করে সাজিয়েছেন তাদের দোকানপাট। এনেছেন নিত্যনতুন ডিজাইনের পোশাকাশাক। ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পোষাকাষাকের জন্য প্রসিদ্ধ নগরের নয়াসড়ক ও কুমারপাড়া এলাকার সমগ্র রাস্তায় বিভিন্ন রংয়ের বাতি জ্বালিয়ে রেখেছেন ব্যবসায়ীরা। তাছাড়া শপিংমল ও মার্কেটগুলো সাজিয়েছে রেখেছেন তারা।

ব্যবসায়িরা জানান, গেল দু’বছর করোনার বিধিনিষেধ থাকায় ব্যবসা হয়নি। এতে আমরা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। বর্তমানে করোনা পরিস্থিতি অনুকূলে থাকায় বিধিনিষেধ কম। তাই ক্রেতারাও মার্কেটে আসতে শুরু করেছেন। উল্লেখযোগ্য হারে ক্রেতারা আশায় আমরা করোনার ধাক্কা কাটিয়ে উঠায় আশা করছি। বেচাকেনা আলহামদুলিল্লাহ। বেশ জমজমাট ব্যবসা হচ্ছে। স্বস্তির নিশ্বাস নেয়া যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এমন হলে আমরা প্রত্যাশিত ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারবো।

নগরের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি মার্কেট ও শপিংমল ঘুরে দেখা গেছে, দিনের বেলায় ক্রেতাদের আগমন কম। সন্ধ্যা বা তারাবির নামাজের পর ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জিন্দাবাজারের ব্লু-ওয়াটার শপিং সিটির জনপ্রিয় ব্যান্ডের দোকান জারা। একদামে বিক্রি করা এ প্রতিষ্ঠানে কয়েকবার ডুকার চেষ্টা করে বেশ অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ঢুকেছেন জাকিয়া ইয়াসমিন তামান্না। তিনি শুক্রবার রাতে বলেন, ‘নিজের ও ছোট ভাই-বোনদের জন্য কাপড় ক্রয় করতে এসেছি। অনেক ভিড়। কয়েকটি দোকানে ঢুকার চেষ্টা করেছিলাম। মানুষের উপস্থিতি এমন যে ঢুকা মুশকিল হয়ে গেছে। অবশেষে কয়েকবার ঢুকার চেষ্টা করে এ দোকানে প্রবেশ করেছি। কাপড়ের দাম বেশি। তবে ঈদ ঘনিয়ে আসায় নিজের ও ছোট ভাই-বোনদের জন্য কাপড় ক্রয় করেছি।’

এবারের ঈদে মেয়েদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে ‘কাঁচা বাদাম’, ‘পুষ্পা’, ‘বাংলালিংক’ ও ‘সকাল-সন্ধ্যা’ শাড়ি। বাহারি রঙ্গের ‘পুষ্পা’ ও ‘কাঁচা বাদাম’ নামের থ্রি-পিসও ইতোমধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছে। বিক্রেতারা প্রত্যাশা বলছেন, নতুন নামের কালেকশন ভালো বিক্রি হচ্ছে। এবারের ঈদ মার্কেটে ঝড় তুলবে পুষ্পা ও কাঁচা বাদাম নামর শাড়ি ও থ্রি-পিস। এছাড়াও জয়পুরি জর্জেট, অরগাঞ্জা, কাস্মীরী কাতান এবং পাকিস্তানি ও কাস্মীরী জর্জেট দৃষ্টি কাড়ছে নারী ক্রেতাদের।

জিন্দাবাজারের ব্লু-ওয়াটার শপিং সিটির জারা ফ্যাশন হাউসের মালিক জুনাইদ আহমদ বলেন, ‘বিগত দুই বছর রমজানেও অতিমারি করোনার কারণে সিলেটসহ সারাদেশে লকডাউন ছিল। শেষ মুহূর্তে ঈদের কয়েকদিন আগে লকডাউন শিথিল করে দোকান খুলে দেওয়া হলেও ক্রেতাদের তেমন একটা সাড়া মেলেনি। এবার করোনা না থাকায় আগেভাগেই ক্রেতারা আসছেন। নিজেদের পছন্দের জামা কিনছেন। আশা করছি, ব্যবসা ভালোই হবে।’

নয়াসড়ক এলাকার মাহা বিপণিবিতানে আসা সৈয়দ মোত্তাকিম নামের এক ক্রেতা বলেন, ‘ঘুরে ঘুরে দেখছি। পছন্দ হলে কিনব। রাতের বেলা মার্কেটগুলো অনেক সুন্দর দেখায়। চারদিকে লাল-নীল বাতি। দাম একটু বেশি মনে হচ্ছে। দুই-এক দিনের মধ্যে পরিবারের সব সদস্যদের নিয়ে আসবো। ’

নগরের প্রাণকেন্দ্র জিন্দাবাজারের কাকলী শপিং সেন্টার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি জাকারিয়া ইমরুল বলেন, এবার ঈদে বেচাকেনা ভালো আছে। তবে এখন রাতের বেলায় প্রচুর ক্রেতারা আসছেন। কেউ কেউ ক্রয় করছেন আবার কেউ কেউ পছন্দ করে যাচ্ছেন। আলহামদুলিল্লাহ ব্যবসা ভালো হচ্ছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আসকে আমরা চাই কাস্টমারদের নজরে আনতে মার্কেট কমিটির পক্ষ থেকে সাজিয়ে গুজিয়ে রাখতে। প্রতিযোগিতার বাজারে ঠিকে থাকতে এটা আমাদের বিজনেস পলিসি।

এদিকে, ঈদবাজারে ছিনতাইসহ নানা ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে তৎপর সিলেট মহানগর পুলিশ। এসএমপি কমিশনার নিশারুল আরিফ রমজানের শুরুতে ব্যবসায়ীদের নিয়ে বৈঠক করেছেন। ক্রেতা-বিক্রেতাদের সুবিধার্থে সকল ধরনের সহযোগিতার কথা বলেছেন। কথায় আর কাজে এসবের বাস্তবায়ন করছেন কমিশনার নিশারুল আরিফ। এসএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া) বি এম আশরাফ উল্ল্যাহ তাহের বলেন, ‘আমরা ক্রেতা-বিক্রেতাদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। জনবহুল প্রতিটি মার্কেট ও শপিংমলে শিফট ভিত্তিক ফিক্সড নারী ও পুরুষ পুলিশ সদস্য নিযুক্ত করেছি। তারা ক্রেতা-বিক্রেতাদের নিরাপত্তার জন্য সার্বক্ষণিক কাজ করছেন। তাছাড়া এসএমপির কোতোয়ালি মডেল থানার ১০ টি টহল টিম বৃদ্ধি করেছি। পোষাক ও সাদাপোষাকে বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য বাজার মনিটরিং করছেন। কোথায় অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে কয়েক মিনিটের মধ্যে সেখানে যাতে পৌঁছাতে পারি এমন ভাবে আইনশৃঙ্খলা ইউনিট গঠন করেছি। তাছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে মার্কেট ও শপিংমলের পাশাপাশি  গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে চেক পোস্ট বসিয়ে নিরাপত্তা জোরদার করেছি। আমরা ক্রেতা-বিক্রেতাদের স্বার্থে খুবই তৎপর ও কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছি।’

এসএমপির মুখপাত্র আশরাফ আরও বলেন, ঈদ পরবর্তী সময় অনেক জায়গা অপ্রত্যাশিত কিছু হয়ে যায়। এক্ষেত্রে আমরা তো আছি। পাশাপাশি বিট পুলিশিংয়ের সাথে যাঁরা জড়িত আছেন তাদের ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদ্বয়ের সহযোগিতা কামনা করছি।

“কেউ যদি বিপুল সংখ্যক টাকা বা মূল্যবান জিনিসপত্র বহন করেন; তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে এসএমপি। প্রয়োজনে তাদেরকে পুলিশি পাহারায় গন্তব্যে পৌঁছিয়ে দেয়া হবে, বলছিলেন বিএম আশরাফ উল্লা তাহের”

অপরদিকে, বিভিন্ন শপিংমল ও মার্কেটের আশপাশে যাতে যানজট না লাগে সেক্ষেত্রে এসএমপির ট্রাফিক বিভাগ তৎপর রয়েছে। তাদের মধ্যে শপিংমল ও মার্কেট কমিটি নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ দিয়েছে। তারাও যানজট নিরসনে কাজ করছেন। যেখানে অবৈধ পার্কিং করা হচ্ছে সেখানে জরিমানা করছে ট্রাফিক পুলিশ। পাশাপাশি সর্তকতা বাড়াতে  প্রচারও করছে। গেল কয়েকদিনে বেশ কিছু মামলা দেয়া হয়েছে বলে এসএমপির ট্রাফিক বিভাগের ডিসি ফয়সল মাহমুদ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যানজট নিরসনে ট্রাফিক পুলিশ বরাবরের মতো কাজ করছে। তবে এখন তো ঈদ বাজার তাই আমরা আরও বেশি তৎপর। অবৈধ পার্কিং বা কোনো যানবাহনের কারণে অযথা যানজট সৃষ্টি হলে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমাদের মতো যানজট নিরসনে বিভিন্ন শপিংমল ও মার্কেটগুলোর স্বেচ্ছাসেবীরা কাজ করছে।’

সংবাদটি শেয়ার করুন