কে হবেন সিলেট জেলা পরিষদ প্রশাসক?

সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক:: সিলেট জেলা পরিষদের নির্বাচিত পরিষদের মেয়াদ ৫ বছর পূর্ণ হয়েছে বেশ কয়েকদিন আগে। তবে মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা পরিষদের নির্বাচিত পরিষদ বিলুপ্ত করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পরবর্তী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচিত পরিষদ দায়িত্ব পালনের বিধান থাকলেও জেলা পরিষদ আইন (সংশোধন-২০২২) অনুসরণে বর্তমান পরিষদের মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় বিলুপ্ত করা হয়েছে। গত ১৭ এপ্রিল স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় নির্বাচিত পরিষদকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সন্দ্বীপ কুমার সিংহকে দায়িত্ব পালন করার জন্য নিযুক্ত করেছে। বর্তমানে তিনি জেলা পরিষদের প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা পরিচালনা করবেন। তবে আইন অনুযায়ী শিগগিরই সিলেট জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ করবে সরকার।

জেলা পরিষদ (সংশোধন) বিল-২০২২ এর বিদ্যমান আইনে ৮২ নম্বর ধারা সংশোধন করে বলা হয়েছে- এতে কোনো জেলা পরিষদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে এবং পরবর্তী পরিষদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত পরিষদের কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য সরকার একজন উপযুক্ত ব্যক্তিকে বা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কোনো কর্মকর্তাকে প্রশাসক নিয়োগ করতে পারবে। প্রশাসকের মেয়াদ ও অব্যাহতি সরকার কর্তৃক নির্ধারিত হবে। এক্ষেত্রে সিলেট জেলা পরিষদের নতুন প্রশাসক নিয়োগের চিন্তা করছে সরকার। তাই ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সিলেটের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা প্রশাসক হওয়ার জন্য দৌঁড়ঝাপ শুরু করেছেন। ইতোমধ্যে জেলা পরিষদ প্রশাসক হতে বেশ কয়েকজন নেতা প্রকাশ্যে ও কর্মী সমর্থকদের মাধ্যমে নিজেদের নাম উচ্চারিত করছেন।

তাদের মধ্যে রয়েছেন, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ, জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরী, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আসাদ উদ্দিন আহমদ ও বিজিত চৌধুরী।

প্রশাসক হতে লবিং করছেন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ। তিনি ঠান্ডা মাথায় কাজ করেন বলে খ্যাতি রয়েছে। যদিও এর আগে তিনি সিলেট-৫ আসন থেকে বারবার নির্বাচন করার প্রত্যাশা করছিলেন। মাসুকের মতো প্রশাসক হতে চান তারই সহোদর মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ। তিনি সর্বশেষ সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রশাসকের দায়িত্ব সফলতার সঙ্গে পালন করেছেন এবং নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত কমিটির হাতে দায়িত্ব তোলে দেন। সার্বিক দিক বিবেচনায় তিনিও এ পদে আসতে পারেন। যদিও তিনি সিটি করপোরেশন নির্বাচন করার লক্ষ্যে কাজ করে দিনরাত নগরের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে ছুটছেন।

তাদের মধ্যে খানিকটা এগিয়ে সিলেট-২ আসনে ‘নিখোঁজ’ বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীকে ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে পরাজিত করে সাংসদ নির্বাচিত হওয়া শফিকুর রহমান চৌধুরী। তিনি গেল ২০১৪ আর ২০১৮ সালের নির্বাচনে দলীয় মনোনীত প্রার্থী হয়েও মহাজোটের প্রার্থীর জন্য সিট ছেড়ে দেওয়ায় নির্বাচন করেনি। মহাজোটের প্রার্থীকে ২০১৪ সালে বিজয়ী করাতে পারলেও ১৮ সালে ত্রিমুখী কোন্দলে পারেনি ২৪ ঘণ্টার রাজনীতিবিদ খ্যাত শফিক। দলের জন্য ছাড় (স্যাক্রিফাইস) করার মনমানসিকতা সবসময় শফিক চৌধুরীর কাছে দেখা গেছে। সর্বশেষ সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সভাপতি প্রার্থী ছিলেন দলের বয়োজ্যেষ্ঠ নেতা প্রয়াত নির্বাচিত জেলা পরিষদ প্রশাসক লুৎফুর রহমানকে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মনোনীত করলে নেত্রীর সিদ্ধান্তকে মাথা পেতে নেন শফিক। তিনি সবসময়ই দলীয় সভানেত্রীর আনুগত্যশীল। তাই ছাড় দেয়ার মানসিকতার পুরস্কার আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শফিক চৌধুরীকে প্রশাসক নিয়োগ দিতে পারে সরকার। এমনটাই শোনা যাচ্ছে।

সর্বশেষ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের কমিটি থেকে টানা তিনবারের সাংগঠনিক সম্পাদক পদ থেকে বাদ পড়া মিসবাহ উদ্দিন সিরাজকেও জেলা পরিষদ প্রশাসকের পদে সরকার নির্বাচিত করতে পারে। তিনি সর্বশেষ কয়েকটি নির্বাচনে সিলেট-১ ও সিলেট-৩ আসনে দলীয় মনোনয়ন চেয়ে ব্যর্থ হয়েছেন।

এ পদে বসতে আগ্রহী মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি বিজিত চৌধুরী। তিনি সিলেট চেম্বারের নির্বাচন পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। সেইসাথে ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃত্ব সামনে থেকে দিচ্ছেন ডাকসাইটে এবং আপোসহীন এ সাবেক ছাত্রনেতা। গেল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নে সংখ্যালঘুদের যথাযথ মূল্যায়ন করেছে সরকার। সেই ধারাবাহিকতায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিবেচনায় সরকার তাকে প্রশাসক পদের বসাতে পারে।

সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘বিষয়টি একান্ত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার। নেত্রী যাকে যোগ্য এবং গ্রহণযোগ্য বিবেচনা করবেন তিনিই প্রশাসক পদে নিযুক্ত হবেন। আমি সবসময়ই নেত্রীর সিদ্ধান্তকে শ্রদ্ধা জানাই।’

উল্লেখ্য, সিলেট জেলা পরিষদের প্রথম প্রশাসক মনোনীত হন জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি আব্দুজ জহির চৌধুরী সুফিয়ান। নিঃসন্তান সুফিয়ান চৌধুরী ২০১১ সালে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব লাভ করেন। ২০১৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করলে ২০১৬ সালের ১৯ জুলাই সিলেট জেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত প্রশাসকের দায়িত্ব লাভ করেন জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি লুৎফুর রহমান। পরবর্তীতে শূন্য পদে ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর জেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে লুৎফুর রহমান সিলেট জেলা পরিষদের প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তিনি গেল বছরের ২ সেপ্টেম্বর মারা গেলে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি ও জেলা পরিষদের ৬ নং ওয়ার্ডের সদস্য জয়নাল আবেদীন। তিনি গত ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত জেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন